নারী দিবসের কিছু কথা

রাজনীতি


হিমাংশু দেব বর্মণ
অধিকার আদায়ের কথা বলতে বা দাবি তুলতে বিশেষ কোন দিনের দরকার হয় না। যখন বৈষম্য দেখা যায় তখনই সাম্যের দাবি নিয়ে কথা বলার উৎকৃষ্ট সময়। বলতেও হবে তাই। তারপরও কেন যেন আমরা বিশেষ দিনে মমি হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। গতকাল ৮ মার্চ নারী দিবসের দিনে নারী অধিকার সম্বলিত বিষয় নিয়ে যত কপচাকপচি দেখা গেছে, আজ ভোরেই তার কোন রেশই নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটটা ঠিক এমনই।সুদূর প্রাচীন থেকে বয়ে আসা নারীর পথচলা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে সমাধান হিসেবে যেটুকুই পাওয়া যায়, উনিশ শতকের গোড়ার দিকেরই কথা। পরবর্তীতে আসলে নারীকে যতটা উন্মুক্ত দেখা যায় তার পেছনেও রয়েছে নানা বঞ্চণার ইতিহাস। যদি আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজি, তাহলে কী পাব একটু ভেবে দেখি।
নারী আজ স্বধীন না পণ্য? আমরাই বলে থাকি, সব জায়গাতেই নারীর অগ্রাধিকার। সরকারী চাকরিতে কোটা পাচ্ছে নারীরা। বেসরকারী অফিসেও নারীদের অগ্রাধিকার। কিন্তু সেখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নারী প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি জোর দেয়া হয় তার সুন্দর হেরা ও স্মার্টনেসের ওপর। তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়ালো, এটা ভাবতে আমাদের বেশি লাগার কথা নয়।
যখন ছোট ছিলাম, তখন চলার পথে দেখতাম লোকাল গাড়িতে নারীেেদর জন্য আলাদা আসন ব্যবস্থা থাকত। ১ পাশের আসনগুলোতে বসতো পুরুষ যাত্রীরা। আরেক পাশে মহিলা যাত্রীরা। মহিলা আসনগুলো যখন পূর্ণ হয়ে যেত, তখন কোন মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে পুরুষেরা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসতে দিত। তখন তো নারী অধিকারের কথা তেমন একটা শোনা যেত না। তারপর নারী অধিকারের প্রসঙ্গ এলো, নারী আন্দোলন হলো, অধিকারও পেল নারী। কিন্তু লোকাল গাড়িতে এখন নারীদের দাঁড়িয়েই গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। ঢাকা শহরের লোকাল গাড়িতে তো মহিলা আসন নেই বলে তাদেরকে ওঠাতেই চান না। এই হলো অবস্থা।
বিশেষ করে নারীদেরও যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে এর মধ্যে। বলা যায় গোঁড়ামীও। আমার চোখে দেখা এমন অনেক নারীই আছেন, যারা বিয়ের পূর্বে বর্ণ প্রথা, যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। যৌতুকের বিপক্ষে থেকে পরিবারের অনুমতিতে প্রেমিকের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন পরে পরিবার থেকে যখন মেনে নিয়েছে, তখন ওই মেয়ে নিজেই বলেছেন বাবা, তোমার ওমুক ওমুক মেয়ের জামাইকে এত এত দিলে আমার জামাইকে কী দিলে? তখন বাবা অনেক দায়ে পড়েই নিজেকে অপরাধী মনে করে, প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ অন্য সব মেয়ের চেয়ে এই মেয়েটাকেই বেশি দিয়ে দিলেন।
তাছাড়া অধিকার আদায়ের দাবির মধ্যেই রয়েছে বড় রকমের ফাঁক। আমরা নারী পুরুষের সমতার কথাই যদি বলি তাহলে আলাদা করে নারীবাদ কেন? একবারেই যদি মানবতাবাদের কথা বলি, তাহলে তার মধ্যে কি নারীবাদ থাকে না? মানবতাবাদ কি নারীকে বাদ দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে? কখনোই না। আসুন, আমরা সমতার মধ্যে আলাদা করে নারীবাদ কথাটা তুলে দিয়ে শুধু মানবতাবাদের চর্চা করতে শিখি। আর এ শিক্ষা পেতেও আমাদের বিশেষ কোন দিনের প্রয়োজন নেই। চেষ্টা করতেও বিশেষ কোন সময়ের সময়ের দরকার নেই।


Comments