ইলা লিপির কবিতাগুচ্ছ

কবি : ইলা লিপি
সাহিত্য

কবি পরিচিতি :
কবি ইলা লিপি একজন চাকরিজীবি। তাঁর পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি বই পড়া আর লেখালেখির প্রতি এক উন্মাদ নেশা রয়েছে। এ নেশার বশে তিনি নীরবে নিভৃতে লিখে যান কবিতা। ব্যক্তি ও জাগতিক জীবনের নানা খুঁটিনাটি তাঁকে ভাবুক করে তোলে। আর সে ভাবনা থেকেই তিনি লিখতে বসেন। কবিতার ভাষায় এঁকে যান জাগতিক জীবনচিত্র।


(১)
ক্যানভাস

বাউল চেতনা আঁকতে গেলে
তরতর করে বাড়ে স্বপ্নের কঁচি ডগা
রোমান্টকি গল্প খোলে এক জীবনের নির্জনতা।
কিছু মন্ত্র বেরিয়ে পড়ে -
একটি বিশ্বস্ত সিঁড়ির খোঁজে
অথচ এই দ্যাখো শূন্যতা মেখে
কেমন একা হয়ে আছি।

(২)
নাম না জানা নামতার খোঁজে

ঘূর্ণিস্রোতে ভেসে যায়
ভাজে ভাজে বেড়ে যাওয়া কলঙ্ক।
এই আহূত অনাচার দুর্দান্ত রকম বাজে।

পঠিত ইতিহাসে কোন চিহ্ন নেই
মুছে যাওয়া সাজে কৌশলে ঝরে যেতে হয়;
ছুয়ে দ্যাখ উত্তাপে বিষের গুঞ্জন
অধিকৃত সাম্রাজ্যের চেয়েও কিরকম বিশালতা।

স্বপ্নখেকো মাতাল,
দীর্ঘ সন্তাপে অন্ধকার খেয়ে বাঁচে,
নাম না জানা নামতায় আঁকে
বিষন্নতার আলোক মুদ্রা।

(৩)
জ্যোৎস্নার ইশতেহার

ইশতেহারে বলা ছিলো
আমার বারান্দায় কোনদিন অন্ধকার নামবে না।

তারপর ক্রমাগত রোদ শুষে খেয়েছে জ্বলে যাওয়া রাত।

ভাঙ্গা বেহালার খাঁচে মূর্ছনার সুর
ঝরে যাওয়া আকাশে দীর্ঘ অপেক্ষা উড়িয়ে
যাবতীয় স্পর্শের কাতরতা মুছে দিয়েছে।

করতালে নীতিহীন নির্যাস
প্রথম আলোর সন্ন্যাসে পূর্ণিমা-চাঁদের বিকৃত হাসি দেখে
ক্রমেই সরে গেছে তুমুল আয়োজন।

শুরুর যবনিকা টানতে না চাওয়ার ভেতর মহত্বদের,
ডানা ভাঙা বিকেলের মতো পেলবতা নেই।
ওই দূরের জ্যোৎস্নায় প্রেমিকের ইজেলে
হতাশার বিভ্রম দোল খেতে খেতে
নির্জলা সমার্থক শব্দরা তাঁরাখসা রাত হয়ে গেছে।

দৃশ্যর অগোচরে মূর্ছনার গোলমুখ যুগিয়েছে শিল্পের রসদ।

(৪)
বৃত্ত

সম্ভ্রমের সংগীত জানে কতটা সন্দেহ নিয়ে যৌবন গড়িয়ে যায়।
কিছু মানুষ এইসব বৃত্ত ভেঙ্গে রচনা করে পড়ন্ত বিকেলের আলোছায়া।

কণ্ঠনালি চুয়ে নামে ঋণে জর্জরিত শিল্পকলা।
বোধ আর বিভ্রমের মৌনতায় লোটে শব্দের গ্রাস।

প্রতিবেশীর আশ্চর্য নীতিতে গড়া ধর্মমন্দীর
দেয়ালের পাজরে লেপন করে অনুতাপের দীর্ঘশ্বাস-
না পাওয়ার বেদনা।

মিলিয়ে যাওয়া শিশিরের শেষ উক্তি
বাঁধাই করে কুয়াশা প্রচ্ছদে।
অথচ তোমাকে চাইবার দ্বিধাগুলো অক্টপাশ হয়ে জ্বলে।

ভুল পথই গিরিখাদ -
পাহাড়ের চুড়োয় একাকার মগ্নতা
কোন দৃশ্যের অজুহাত না হয়ে
অবজ্ঞা হতে পারত।

সে
স্তন শিশু খাদ্য নয়।
বহন করে ক্যান্সার জীবানু
নারী ও মৃত্যুর মাঝখানে
স্যাঁতসেঁতে ছত্রাক।

সে পিঠে নয়
বুকে
দাঁড়িয়ে থাকে
দলছুট পিঁপড়ের মত।

জিজ্ঞেস কর না,
আপনি কেমন আছেন?
পাজর ভেঙ্গে ফিনকি দেবে দীর্ঘশ্বাস।

এই অস্থিরতা মাপার আয়তক্ষেত্র নেই।

প্রেমিক হবার দিনগুলোতে
একা থেকে।
এসব ভাবতে গেলে
সবকিছু তোমার ডাকনাম হয়ে ওঠে।

(৪)
নস্টালজিয়া

হারিয়ে গেছো জেনেই,
রংধনু বেঁকে গেছে কয়েকশো গুণ।

মুগ্ধতা নিয়েই পার হয়
শুধু সন্ধ্যার কলঙ্কিত থাবা দুনিয়া কাঁপায়।

আমরা কেন জনান্তিকে কথা শোনাতে পারি না?

এই দ্বৈত নাগরিক ক্লান্তিই দৃশ্যের স্মৃতিসৌধ করে দেয়।

আহ্বানে সাড়া নেই,
বিষ্ময়ের চোখে লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইচ্ছে হয়
কেন্দাতিগ প্রচারণা অথবা শব্দের চিলেকোঠা।

উচ্ছাসের কথাগুলো স্বপ্নঘুড়ি হয়ে
শেষ দেখা নোনা বিকেলকেও বিষন্ন করে তোলে।

কিছু নির্জন হাওয়া চনমনে হয়ে ওঠা
উদাস দুপুরে চাল-ডালের সংসার পাতে।

অথচ লাল কাঠের বাড়িতে পৃথিবী অপেক্ষা করে না এখন।


মৃত্যু দিয়ে লিখব কবিতা

আমিও মৃত্যু চাই,
কালো ধারাপাতের মতন।

বরই পাতা, আতর লোবান স্বপ্নে হানা দেয়।

আমি মৃত্যু দিয়ে কবিতা লিখতে চাই।
কেউ কাঁদবার নেই -
ওই দূরের আকাশ, যেখানে অশরীরীরা থাকে
রোজ ঘুমের ঘোরে ভয়ংকর রকমের লোভ দেখায়।

আমি কী লোভি?
বেহেস্তের লোভ!

সাফ জানাতে চাই- বেহেস্তের পরী হতে পারবোনা।
শুধু ঘুমের মৃত্যু চাই, সমাধির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া
কাশফুল নদী চাই।

আমি ও আমার মত অনেকের সমাধির গল্প
ভেসে যাবে ঢেউয়ে ঢেউয়ে।

আমাদের মৃত্যুর গল্পেরা অতিথি পাখির ঠোঁটে
উড়ে যাবে দূরে; বহু দূরে ....।

(৫)
নীরব পঞ্জিকার লাল তারিখ

ভুলতে চাইলেই কাঠচেরাইয়ের করাত নিয়ে হাজির দেহজ রজ্জু।
ভাবি ভুলে যাবো।

জগত ও জ্যোৎস্না ধারণ করে রক্তবর্ণ।
ভুলে যাওয়া হয়ে ওঠে না আর।

পৃথিবীর প্রথম জোয়ারে মাথা রেখে
দাদীমা গল্প শোনাত পুরুষের।

একফোঁটা জলেই জন্ম হয় ঈশ্বরের, দাদীমা বলতেন।
সেদিন জল আর ঈশ্বরের সম্পর্ক নিয়ে
ভেবে কিনারা করতে পারিনি।
আরো বলতেন -
ঋতুর স্রোত বইলে নারী  হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ ।

দাদীমার শেখানো সরল সূত্রগুলোই
নীরবতার প্রাচীরে পঞ্জিকার লাল তারিখ

Comments