সাহিত্য
হিমাংশু দেব বর্মণ
এভাবে না হয় আরো কিছুদিন যাক/ আরও কিছৃদিন এক বিছানায় শোয়া/ আরও কিছুক্ষণ এক জানালায় চোখ/ এক চন্দ্রে দুইটি হৃদয় ধোয়া।..... নেহাত যদি না মেলে বুকের ফাঁক/ তখন না হয় পৃথক পথের বাঁক।
জগৎ-সংসারে মৃত্যুই মানুষের শেষ আশ্রয়। মৃত্যুই মুক্তি, আর মৃত্যুই মানুষের জীবনে একমাত্র অবধারিত সত্বা। মানুষের জীবনে অবধারিত বলে আর কিছুই নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অর্থ-প্রতিপত্তি এমন কী কর্মেও কর্তাকে ফাঁকি দেয়। হোক সে কর্তার ভুল; কিংবা সময়ের বৈরীতা। কখনো বা হিতে বিপরীত। কিন্তু মৃত্যু! সময় মতো এসে ঠিকই ধরা দেয়, কাছে টেনে নেয়। আর সেই মৃত্যুর সঙ্গ নিয়েই মানুষকে চলে যেতে হয় মানুষের সঙ্গ ছেড়ে। মৃত্যু আর কোনোদিন তাকে ছেড়েও দেয় না। মৃত্যুর পরে আর কখনো মেশা হয় না কোন মানুষ বা এই বিশ্ব প্রকৃতির সাথে। সমস্ত মেশামিশির সাথে চিরবিদায় ঘটায় এই মৃত্যু। আর সেই পরম বন্ধু, নিষ্ঠুর মরণ এসে ছুঁয়ে দেখার আগেই কবির সরল মনের যে অভিব্যক্তি, তা এখানে ‘আরও কিছুদিন কথার ছলে কথা’ কবিতায় ব্যক্ত করে গেছেন।
তুমি অভিশাপ দিলেও প্রতিবাদের সাহস করিনে/ সে অধিকার তোমার জন্মগত বলে মানি/ তোমার চোখের দিকে তাকাতে মেরুদণ্ড দুর্বল হয়, কেননা/ তোমার পাওনা থেকে কৌশলে আমি বঞ্চিত করেছি তোমায়।/..... আমি তোমার লাটাই ঘুড়ি, দুপুর রোদের গঙ্গাফড়িং/ লুটে নিয়েছি/ আমি তোমায় সমূলে বঞ্চিত করেছি।
একই মানুষ জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, তা থেকে আবার জীবনের শেষ মুহূর্তে উপনীত হওয়া পর্যন্ত একেক সময়ে মূলতঃ একেক পরিচয় হয়। আমরা সেটা বুঝি তার আচরণ বা বৈশিষ্ট্য দেখে। যেমন শিশু, কিশোর, যুবক, সোমত্ত, বয়ঃপ্রাপ্ত, বৃদ্ধ। এর প্রতিটি পরিচয়ে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু দুই পরিচয়ের সন্ধিক্ষণ ব্যক্তির অজানা থেকে যায়। হঠাৎ একদিন সে বুঝতে পারে এতদিনের পরিচয়টা কখন যেন গত হয়ে গেছে। এখন থেকে তাকে অন্য ধাঁচে চলতে হবে। অবশ্য এ চেতনা আসে অন্যের নির্দেশনায়। পিতা-মাতা বা বয়ঃজ্যৈষ্ঠ্যদের ইঙ্গিত বা সরাসরি মুখের কথায়। যেমন স্কুলের শিক্ষক যেদিন পাঠ্য বইয়ের পড়া বোঝতে গিয়ে বললেন, এখন তোমাদের ঝিল্লিপোকা ধরে খেলা করার দিন আর নেই। কারণ ও করণীয়টাও বুঝিয়ে দিলেন। অথচ সেদিনও সকালে কঞ্চির আগায় আঠা লাগিয়ে রেখেছে বিকেলে বাড়িতে এসে ঝিল্লিপোকা ধরবে বলে। কিন্তু শিক্ষকের কথায় সে নিজে তো বিরত হলোই, আরো অন্যকেও ওটা করতে নিষেধ করল। সে হয়ে গেল ছোটদের অভিভাবক। ঠিক তেমনি ঘুড়ি বানিয়ে ঘরে রাখার সময়েই পার করেছি ঘুড়ি ওড়ানোর বয়স। যেদিন বড়দের মুখে শুনেছি বুড়ো ধাঙড়ের কাণ্ড দেখো! সেদিন থেকে আর ঘুড়ি ওড়াইনি। ওটা ঘরেই পড়ে থেকে থেকে অবশেষে ঘূণপোকার পরিপুষ্ট আহারের সামগ্রী হয়েছিল। ঠিক এভাবেই জীবনের সবগুলো অধ্যায় পেরিয়ে যায় মানুষের অজান্তে। কেউ কখনো তা খুঁজেও দেখে না। আর এসব খুটিনাটি দেখার জন্যই মানুষের সমাজে জন্ম হয় এমনই একজন কবির। যিনি চোখে আঙুল দিয়ে মানুষকে দেখিয়ে যান জীবনের প্রতিটি পরতের অদল-বদল। ‘তোমার অমল শৈশব চুরি করেছি’ কবিতায় কবি হিমাদ্রী বসু জাগতিক জীবনের এই অমোঘ নিয়মকেই তুলে ধরেছেন।
মিছিলের সামনের সারিতে থাকলে/ জনপ্রতি মেলে পাঁচশ/ মাঝের সারিতে মেলে পঞ্চাশ/ পিছনের সারিতে থাকলে মেলে এককাপ চা/ ভাঙ্গা টোস্ অথবা একমুট মুড়ি/.... রাজার ঘোড়া আড়াই লাফে করে বাজিমাত/ নূরুলদের কাঙ্খিত চন্দ্র ওঠে না।
কবি কেবল জীবনের বয়ে চলা আর আসা যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চলার পথে যতরকম ছোট বড় অসঙ্গতি চোখে পড়ে তা-ও কবিকে ভাবিয়ে তোলে। কবিও হয়ে ওঠেন বিপ্লবী। মিছিলের সারিতে সারিতে থাকা মানুষগুলোর মাঝেও যে বিভাজন থাকে, তা যে গণতন্ত্রের মানসপুত্ররাই পুষে রাখে, কবি তার ‘রাজার গিনিপিগ’ কবিতায় স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবি হিমাদ্রী বসুর একটি মর্মস্পর্শী কবিতা ‘হাতে এলে অবেলার চিঠি’। তার কথাগুলো কাব্যিকতায় পরিপূর্ণতা পেল কি পেল না, মানবিকতার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, এ মানবিকতার দায়েই তাকে কবি বলতে আর কোন দ্বিধা থাকার কথা নয়। অবেলায় চিঠি এলে যাওয়াটা মুশকিল ঠেকে/ তবু হাতে এলে তেমন কোন ডাক/ নড়ে উঠতে হয়/..... এই ডাক মানুষের মুক্তির মিছিলে মেলার/ তবে সেই ডাকে না দিলে পরাণ সাড়া/ পাপ হয়, পোকা হয় ভিতর আত্মায়...।
সত্যিই, কবির আত্মা হতে হয় পবিত্র। আর মানুষ যখন কলুষিত আত্মার জিম্মি হয়ে তা থেকে মুক্তির আকাঙ্খায় ছটফট করে, হাত নেড়ে সাহায্য চায় অন্যের, তখনই সেই ডাকে সাড়া দিতে কবি মানবিক চেতনাকে জাগ্রত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তার এ কবিতার মধ্য দিয়ে। তিনি এ কথাও বলেছেন সে ডাক যত অবেলাতেই আসুক, যে অবহেলিত প্রাণ সেই ডাক দিক, তখনই সেই ডাকে সাড়া দিতে হবে। সুর মেলাতে হবে মানব মুক্তির গানে। তা না হলে তার হৃদয় পবিত্র হবে না, পাপে পরিপূর্ণ থেকে যাবে।
কবি রুদ্র হাসান এসছিলেন আমার জেলা শহর মাগুরাতে। গাংচিল আয়োজিত দুই বাংলার কবিতা উসবে। নোমানী ময়দানস্থ আছাদুজ্জামান মিলনায়তনে পাশাপাশি দুজন। অনুষ্ঠান চলাকালে কোন এক ফাঁকে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন ‘অবেলার চিঠি’ কাব্যগ্রন্থটি। কবি হিমাদ্রী বসুর লেখা এ কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে এ বছর একুশের বইমেলায়। উনি বললেন, দাদা এটা আপনার জন্য। আর কোন গুণী ব্যক্তি যখন আমাকে একটি বই উপহার দেন, কিছু একটু দায়বদ্ধতা নিজ থেকেই এসে ভর করে আমার ঘাড়ে। অনুষ্ঠান বিরতির ফাঁকে একটু চোখ বুলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। পরে রুদ্র ভাইকে বললাম নতুন হাতের লেখা যদিও, তবুও চেতনাগত দিক দিয়ে হিমাদ্রী বসু একজন কবি। তা কোন রকম বিতর্ক ছাড়াই। কথাটা শুনে উনি বললেন, তাহলে একটি রিভিউ চাই দাদা। ‘এমনিই নাচুনে বুড়ি, তারপর ঢাকের বাড়ি।’ আমি কি আর না বলতে পারি!
কবি হিমাদ্রী বসু একজন তরুণ কবি। তার চেতনা যে তারুণ্যে ভরপুর, তা তার লেখা পড়েই বোঝা যায়। তবে তার পথচলা যাতে আরো সুন্দর হয়, কবিতাগুলো আরো কাব্যময় হয়ে ওঠে, এজন্য কিছু বলে রাখা দরকার। কাব্যিকতার দিক দিয়ে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। শব্দের অসম ব্যবহারে যথেষ্ট ছন্দ পতন হয়েছে। আধুনিক শব্দ ব্যবহারের মধ্যে অসতর্কতা বশত কিছু প্রাচীন শব্দ এসে কিছুটা গোল পাকিয়ে বসেছে। কিছু কিছু বাক্য অযথা লম্বা করার চেষ্টা হয়েছে। কিছু বানানের ব্যাপারে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। বেশ কিছু বানান আছে, অসতর্কতার কারণে সেগুলো প্রাচীন শব্দ হয়ে গেছে। একটু সচেতনভাবে লিখলে সে শব্দটাই আধুনিক প্রমিত শব্দ হয়ে উঠবে। তবে তার লেখার যে প্রেক্ষাপট নির্ধারণ, রচনার যে শিল্পত্ব তিনি দেখিয়েছেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থেই, কাব্যের জগতে তিনি অতি সহজেই জায়গা করে নিতে সক্ষম হবেন, এটা বলা যায় নিঃসন্দেহে।
অবেলার চিঠি
লেখক : কবি হিমাদ্রী বসু
প্রচ্ছদ : উত্তম সেন
প্রকাশক : সাঁকোবাড়ি প্রকাশন
প্রকাশকাল : একুশে বইমেলা-২০১৯
মূল্য : ২০০ টাকা।
জগৎ-সংসারে মৃত্যুই মানুষের শেষ আশ্রয়। মৃত্যুই মুক্তি, আর মৃত্যুই মানুষের জীবনে একমাত্র অবধারিত সত্বা। মানুষের জীবনে অবধারিত বলে আর কিছুই নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অর্থ-প্রতিপত্তি এমন কী কর্মেও কর্তাকে ফাঁকি দেয়। হোক সে কর্তার ভুল; কিংবা সময়ের বৈরীতা। কখনো বা হিতে বিপরীত। কিন্তু মৃত্যু! সময় মতো এসে ঠিকই ধরা দেয়, কাছে টেনে নেয়। আর সেই মৃত্যুর সঙ্গ নিয়েই মানুষকে চলে যেতে হয় মানুষের সঙ্গ ছেড়ে। মৃত্যু আর কোনোদিন তাকে ছেড়েও দেয় না। মৃত্যুর পরে আর কখনো মেশা হয় না কোন মানুষ বা এই বিশ্ব প্রকৃতির সাথে। সমস্ত মেশামিশির সাথে চিরবিদায় ঘটায় এই মৃত্যু। আর সেই পরম বন্ধু, নিষ্ঠুর মরণ এসে ছুঁয়ে দেখার আগেই কবির সরল মনের যে অভিব্যক্তি, তা এখানে ‘আরও কিছুদিন কথার ছলে কথা’ কবিতায় ব্যক্ত করে গেছেন।
তুমি অভিশাপ দিলেও প্রতিবাদের সাহস করিনে/ সে অধিকার তোমার জন্মগত বলে মানি/ তোমার চোখের দিকে তাকাতে মেরুদণ্ড দুর্বল হয়, কেননা/ তোমার পাওনা থেকে কৌশলে আমি বঞ্চিত করেছি তোমায়।/..... আমি তোমার লাটাই ঘুড়ি, দুপুর রোদের গঙ্গাফড়িং/ লুটে নিয়েছি/ আমি তোমায় সমূলে বঞ্চিত করেছি।
একই মানুষ জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, তা থেকে আবার জীবনের শেষ মুহূর্তে উপনীত হওয়া পর্যন্ত একেক সময়ে মূলতঃ একেক পরিচয় হয়। আমরা সেটা বুঝি তার আচরণ বা বৈশিষ্ট্য দেখে। যেমন শিশু, কিশোর, যুবক, সোমত্ত, বয়ঃপ্রাপ্ত, বৃদ্ধ। এর প্রতিটি পরিচয়ে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু দুই পরিচয়ের সন্ধিক্ষণ ব্যক্তির অজানা থেকে যায়। হঠাৎ একদিন সে বুঝতে পারে এতদিনের পরিচয়টা কখন যেন গত হয়ে গেছে। এখন থেকে তাকে অন্য ধাঁচে চলতে হবে। অবশ্য এ চেতনা আসে অন্যের নির্দেশনায়। পিতা-মাতা বা বয়ঃজ্যৈষ্ঠ্যদের ইঙ্গিত বা সরাসরি মুখের কথায়। যেমন স্কুলের শিক্ষক যেদিন পাঠ্য বইয়ের পড়া বোঝতে গিয়ে বললেন, এখন তোমাদের ঝিল্লিপোকা ধরে খেলা করার দিন আর নেই। কারণ ও করণীয়টাও বুঝিয়ে দিলেন। অথচ সেদিনও সকালে কঞ্চির আগায় আঠা লাগিয়ে রেখেছে বিকেলে বাড়িতে এসে ঝিল্লিপোকা ধরবে বলে। কিন্তু শিক্ষকের কথায় সে নিজে তো বিরত হলোই, আরো অন্যকেও ওটা করতে নিষেধ করল। সে হয়ে গেল ছোটদের অভিভাবক। ঠিক তেমনি ঘুড়ি বানিয়ে ঘরে রাখার সময়েই পার করেছি ঘুড়ি ওড়ানোর বয়স। যেদিন বড়দের মুখে শুনেছি বুড়ো ধাঙড়ের কাণ্ড দেখো! সেদিন থেকে আর ঘুড়ি ওড়াইনি। ওটা ঘরেই পড়ে থেকে থেকে অবশেষে ঘূণপোকার পরিপুষ্ট আহারের সামগ্রী হয়েছিল। ঠিক এভাবেই জীবনের সবগুলো অধ্যায় পেরিয়ে যায় মানুষের অজান্তে। কেউ কখনো তা খুঁজেও দেখে না। আর এসব খুটিনাটি দেখার জন্যই মানুষের সমাজে জন্ম হয় এমনই একজন কবির। যিনি চোখে আঙুল দিয়ে মানুষকে দেখিয়ে যান জীবনের প্রতিটি পরতের অদল-বদল। ‘তোমার অমল শৈশব চুরি করেছি’ কবিতায় কবি হিমাদ্রী বসু জাগতিক জীবনের এই অমোঘ নিয়মকেই তুলে ধরেছেন।
মিছিলের সামনের সারিতে থাকলে/ জনপ্রতি মেলে পাঁচশ/ মাঝের সারিতে মেলে পঞ্চাশ/ পিছনের সারিতে থাকলে মেলে এককাপ চা/ ভাঙ্গা টোস্ অথবা একমুট মুড়ি/.... রাজার ঘোড়া আড়াই লাফে করে বাজিমাত/ নূরুলদের কাঙ্খিত চন্দ্র ওঠে না।
কবি কেবল জীবনের বয়ে চলা আর আসা যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চলার পথে যতরকম ছোট বড় অসঙ্গতি চোখে পড়ে তা-ও কবিকে ভাবিয়ে তোলে। কবিও হয়ে ওঠেন বিপ্লবী। মিছিলের সারিতে সারিতে থাকা মানুষগুলোর মাঝেও যে বিভাজন থাকে, তা যে গণতন্ত্রের মানসপুত্ররাই পুষে রাখে, কবি তার ‘রাজার গিনিপিগ’ কবিতায় স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবি হিমাদ্রী বসুর একটি মর্মস্পর্শী কবিতা ‘হাতে এলে অবেলার চিঠি’। তার কথাগুলো কাব্যিকতায় পরিপূর্ণতা পেল কি পেল না, মানবিকতার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, এ মানবিকতার দায়েই তাকে কবি বলতে আর কোন দ্বিধা থাকার কথা নয়। অবেলায় চিঠি এলে যাওয়াটা মুশকিল ঠেকে/ তবু হাতে এলে তেমন কোন ডাক/ নড়ে উঠতে হয়/..... এই ডাক মানুষের মুক্তির মিছিলে মেলার/ তবে সেই ডাকে না দিলে পরাণ সাড়া/ পাপ হয়, পোকা হয় ভিতর আত্মায়...।
সত্যিই, কবির আত্মা হতে হয় পবিত্র। আর মানুষ যখন কলুষিত আত্মার জিম্মি হয়ে তা থেকে মুক্তির আকাঙ্খায় ছটফট করে, হাত নেড়ে সাহায্য চায় অন্যের, তখনই সেই ডাকে সাড়া দিতে কবি মানবিক চেতনাকে জাগ্রত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তার এ কবিতার মধ্য দিয়ে। তিনি এ কথাও বলেছেন সে ডাক যত অবেলাতেই আসুক, যে অবহেলিত প্রাণ সেই ডাক দিক, তখনই সেই ডাকে সাড়া দিতে হবে। সুর মেলাতে হবে মানব মুক্তির গানে। তা না হলে তার হৃদয় পবিত্র হবে না, পাপে পরিপূর্ণ থেকে যাবে।
কবি রুদ্র হাসান এসছিলেন আমার জেলা শহর মাগুরাতে। গাংচিল আয়োজিত দুই বাংলার কবিতা উসবে। নোমানী ময়দানস্থ আছাদুজ্জামান মিলনায়তনে পাশাপাশি দুজন। অনুষ্ঠান চলাকালে কোন এক ফাঁকে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন ‘অবেলার চিঠি’ কাব্যগ্রন্থটি। কবি হিমাদ্রী বসুর লেখা এ কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে এ বছর একুশের বইমেলায়। উনি বললেন, দাদা এটা আপনার জন্য। আর কোন গুণী ব্যক্তি যখন আমাকে একটি বই উপহার দেন, কিছু একটু দায়বদ্ধতা নিজ থেকেই এসে ভর করে আমার ঘাড়ে। অনুষ্ঠান বিরতির ফাঁকে একটু চোখ বুলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। পরে রুদ্র ভাইকে বললাম নতুন হাতের লেখা যদিও, তবুও চেতনাগত দিক দিয়ে হিমাদ্রী বসু একজন কবি। তা কোন রকম বিতর্ক ছাড়াই। কথাটা শুনে উনি বললেন, তাহলে একটি রিভিউ চাই দাদা। ‘এমনিই নাচুনে বুড়ি, তারপর ঢাকের বাড়ি।’ আমি কি আর না বলতে পারি!
কবি হিমাদ্রী বসু একজন তরুণ কবি। তার চেতনা যে তারুণ্যে ভরপুর, তা তার লেখা পড়েই বোঝা যায়। তবে তার পথচলা যাতে আরো সুন্দর হয়, কবিতাগুলো আরো কাব্যময় হয়ে ওঠে, এজন্য কিছু বলে রাখা দরকার। কাব্যিকতার দিক দিয়ে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। শব্দের অসম ব্যবহারে যথেষ্ট ছন্দ পতন হয়েছে। আধুনিক শব্দ ব্যবহারের মধ্যে অসতর্কতা বশত কিছু প্রাচীন শব্দ এসে কিছুটা গোল পাকিয়ে বসেছে। কিছু কিছু বাক্য অযথা লম্বা করার চেষ্টা হয়েছে। কিছু বানানের ব্যাপারে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। বেশ কিছু বানান আছে, অসতর্কতার কারণে সেগুলো প্রাচীন শব্দ হয়ে গেছে। একটু সচেতনভাবে লিখলে সে শব্দটাই আধুনিক প্রমিত শব্দ হয়ে উঠবে। তবে তার লেখার যে প্রেক্ষাপট নির্ধারণ, রচনার যে শিল্পত্ব তিনি দেখিয়েছেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থেই, কাব্যের জগতে তিনি অতি সহজেই জায়গা করে নিতে সক্ষম হবেন, এটা বলা যায় নিঃসন্দেহে।
অবেলার চিঠি
লেখক : কবি হিমাদ্রী বসু
প্রচ্ছদ : উত্তম সেন
প্রকাশক : সাঁকোবাড়ি প্রকাশন
প্রকাশকাল : একুশে বইমেলা-২০১৯
মূল্য : ২০০ টাকা।

Comments
Post a Comment