সাহিত্য
হিমাংশু দেব বর্মণ
সামান্য একটা মুহূর্তের ভুল নদীর জীবনে এনে দিয়েছে অসহনীয় যন্ত্রণা। সে ভেবেই পায় না এমনটি কেন হলো! সে তো কখনোই প্রহরকে অবিশ্বাস করেনি। ওই দিনে ওই মুহূর্তে কেন সে তাকে বিশ্বাস করতে পারল না? তখন তো সে নিরেট সত্যিটা নিয়েই মুখোমুখি হয়েছিল নদীর। কিন্তু নদী কেন সেদিন তাকে মিথ্যুক ভাবলো? তবে সে যাই হোক, প্রহর এখন অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে দিব্যি সংসার পেতে বসেছে। এখন কেন তাকে নিয়ে ভাববে নদী? সিদ্ধান্ত নেয় প্রহরকে আর ফোন দেবে না। ওর সাথে কোনো যোগাযোগই রাখবে না। প্রহর যাতে ফোন করতে না পারে, সে জন্য নদী মোবাইলের সিমকাডর্ বদলে ফেলে। কিন্তু যে কারণে সে নতুন সিমকার্ড কিনলো, মোবাইলে সিমটা অন করে সেই আসল কথাটাই ভুলে গেল। ভাবল, তাইতো- নতুন সিমকার্ড কিনলাম, প্রথম কলটা তো প্রহরকেই করতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে ফোন দেয়-
হ্যালো- প্রহর, আমি নদী। তুমি কেমন আছো?
আমি ভালো আছি, এটা কার ফোন নম্বর?
কেন- আমার!
তুমি এত ঘন ঘন ফোন আইডি বদলাও কেন?
তোমার জন্য। তোমার সাথে আর যোগাযোগ করব না, তাই। তুমি যাতে আমাকে ফোন দিতে না পারো। কিন্তু জানো প্রহর, নতুন আইডির প্রথম কলটা তোমাকে না করেই পারি না। যে কারণে আইডিটা বদলে ফেলি, ঘুরে ফিরে সেই কাজটাই আগে করে বসি। এমন কেন হয় বলতো প্রহর! প্রহর কোনো কথা বলতে পারলো না। কেঁদে ফেলে নদী। সময়টা তখন রাত দশ এগারোর মাঝামাঝি। প্রহর তখন বিছানায়। পাশে তার স্ত্রী বর্ষা। বিয়ের পর পরই প্রহর সব বলেছে বর্ষাকে। ও কিছু মনে করেনি। নদীর কান্না থামাতে সান্ত¡নার সুরে অনেক মিষ্টি কথা বলল প্রহর। নদী জানতে চাইল বর্ষা পাশে জেগে আছে কি না। প্রহর বলল হ্যা আছে, যা বলো সমস্যা নেই। কান্নার মাঝেই নদী বলল প্রহর, আজকের রাতটার কথা ভাবো তো। তোমার পাশে বর্ষা, আর আমি ছাদে একাকী। প্রহর, যদি পারতাম, আজকের পর পৃথিবীর বুকে আর একটি রাতও আসতে দিতাম না! তাহলে বুকের আগুন কিছুটা নিভে থাকতো। বর্ষাকে আমি চোখে দেখিনি। না জানি ও কত পূণ্যবতী। কত সাধনা করেছিল সে। তাই সে তোমাকে আমার কাছ থেকে--। লাইন কেটে দিল। প্রহর নিজের ফোন সেট থেকে ফোন দিল কয়েকবার। নদী রিসিভ করলো না। আর ঘুমাতে পারলো না প্রহর। বর্ষা সব বুঝতে পারলো, বলল না কিছুই। এ রাতে আর কোনো কথাই হলো না দুজনের মাঝে। ফোন সেটটা বন্ধ করে রেখে দিল প্রহর।
রাতে ঘুমতে পারেনি বর্ষাও। সকালে ফোলা ফোলা চোখে তাকিয়ে বলল, শোনো প্রহর- আমি জানি তুমি নদীর সাথে কথা না বলে থাকতে পারবে না। তাই বলি, কথা তুমি বলবে। তবে আমার সামনে নয়, আড়ালে। তুমি পুরুষ, এটা যে আমার জন্য কত কষ্টের- সে তুমি বুঝবে না।
প্রহরের সমস্ত চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল। তাই তো, যার ভুলেই হোক, যে ভুলেই হোক, দুজন দুদিকে ছিঁটকে পড়েছি। এখন তাকে নিয়ে আমার দাম্পত্যের মাঝে অশান্তি ডেকে আনব কেন? তাছাড়া নদীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলে সেও ধীরে ধীরে সয়ে নেবে। এটা হতেই হবে। হ্যাঁ, নদীকে বললে ব্যপারটা সে বুঝবে। রাতে সে কেঁদেছে খুব। এখন তাকে কিছু একটা বলা দরকার। নদীকে ফোন দিল প্রহর। নদী এবারও রিসিভ করল না। প্রহর বুঝল নদী কী একটা জিদ ধরেছে। কিছুক্ষণ পর সে অন্য একটা ফোন থেকে ফোন দিল নদীকে। এবার নদী রিসিভ করল। বর্ষার বলা কথাগুলো নদীকে বলল প্রহর। আরও সে নদীকে ফোন দিতে নিষেধ করল। প্রহরও তার ফোন আইডি বদলে ফেলল।
নদী অনেকবার চেষ্টা করে প্রহরের ফোনটা খোলাই পেল না। ভাবে তাই তো, আমার জন্য প্রহরের দাম্পত্য অশান্তিতে ভরে থাকবে! আমি প্রহরের কষ্ট সহ্য করতে পারব না। আমার ভুলে আমি ওকে পাইনি। সে শাস্তি পেতে পারে না। আমি বর্ষার সাথে দেখা করব। ওকে সব বলে বোঝাব। আবার ভাবে তাই তো, আমি ওর সামনে গেলে যদি আরও ক্ষেপে যায়! কোনো কিছুতে সান্ত¡না পায় না নদী।
প্রহরের মনে যত কষ্টই থাক, বর্ষার সাথে সে স্বাভাবিকই থাকে। বর্ষাকে সে ভালোবাসে খুব। কেন নয়? বর্ষা তো কোনো অন্যায় করেনি। প্রহর নিজে তাকে বিয়ে করে এনেছে। রাতে বিছানায় শুতে গিয়ে বর্ষা বলল, নদী আর ফোন দিয়েছে?
ও আর ফোন দেবে না।
কেন?
আমি নিষেধ করে দিয়েছি। নতুন ফোন আইডিটা ওকে দিইনি। তুমি বিশ্বাস করো বর্ষা-
প্রহর, তুমি যে কী! মেয়েটাকে কত কষ্ট দিলে তুমি, তা একবার ভেবে দেখছ? আমি এটা বলিনি তোমাকে প্রহর!
আজ বলোনি। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একদিন তোমাকে বলতে হতে পারে। তাই তার আগেই যেটা উচিৎ, সেটাই আমি করেছি। এটা এ পর্যন্তই-
না, তা হয় না। আশ পাশের আর পাঁচটা বৌ-এর মতো করে আমাকে দেখো না প্রহর। আমি ঠিক আমার মতোই থাকতে চাই। শোনো, নদী তোমাকে কাছে পায়নি, পাবেও না কোনোদিন, সে তা জানে, মানে, বিশ্বাসও করে। তারপরও সে তোমার সাথে কথা বলে কষ্টে ভরা বুকটার কিছুটা হালকা করে। তুমি তা থেকেও তাকে বঞ্চিত করলে- হয় সে মারা যাবে, না হয় পাগল হয়ে যাবে। এটা তুমি করো না প্রহর। ওর কিছু হয়ে গেলে আমাকেই দায়ী থাকতে হবে। দাও, ফোনটা দাও, আমি ওর সাথে কথা বলব।
উপায় নেই বর্ষা। ওর নতুন ফোন আইডি আমার কাছে নেই। ফোন করে ওকে পাবে না তুমি।
তুমি আস্ত একটা গাড়ল। বোধ ভাস্যি কিছুই নেই তোমার। প্রহর, তুমি জানো না ওর সাথে আমার কী কথা হয়েছে! কিন্তু তোমার এই ব্যবহারে সে কী ভাববে-এটাই আমার দুঃখ। ও যে কত ভালো মেয়ে আমি বুঝে গেছি। তাই তো তোমাকে বাধা দিইনি। প্রহর আমি তোমার স্ত্রী হতে পেরে কত জনমের সুখ এক জনমেই হাতের মুঠোয় পেয়েছি তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। এটা কার জন্য জানো? নদীর জন্য। নদী ওইদিন তোমার হাত ধরে বেরিয়ে এলে তুমি আমাকে বিয়ে করতে না। থাক ওসব, তুমি ফোনে পুরনো আইডিটা লাগাও। ও অবশ্যই ফোন করবে। সে তোমার কাছে ফোন না করে পারে না।
এই মুহুর্তে প্রহর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকা বলে জানলো। প্রহর ভাবে সে আজও নাবালক। যেন কোনোদিন সাবলক হয়নি। কৈশোর পেরিয়ে আদৌ সে যৌবন প্রাপ্ত হয়নি। ও-এতদিন যা বুঝেছে তার সবই ছিল আবেগ, ছিল ভুল। এখনও সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। নদীর কথা শুনেই যে বর্ষার তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠার কথা ছিল, সেই বর্ষা কি না নদীর জন্য ব্যকুল। বিশ্ব প্রকৃতির এ কি রহস্য! প্রহর কেবলই বিষ্মিত হয়।
বর্ষার স্বীকৃতি পেয়ে প্রহরের আনন্দে লাফিয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু সে যেন কেমন বোর হয়ে যাচ্ছে। প্রহরকে পেয়ে বর্ষা যে মহাসুখী সে তা জানালো। কিন্তু বর্ষাকে পেয়ে প্রহর ও যে কতটা ধন্য তা ওকে বলে বোঝানোর ভাষা খুঁজে পায় না সে। পৃথিবীর সব নারী থেকে একেবারেই আলাদা ধাচের মেয়ে বর্ষা। কিন্তু নদী! হ্যাঁ, এখনকার বিষয়টা বর্ষার উপরই ছেড়ে দেয়া উচিৎ। কথা বাড়ালো না প্রহর। পুরনো আইডিটা সেট করল ফোনে। নদীর পুরনো আইডিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো বর্ষা।
প্রহরকে ফোনে না পেয়ে নদী আর স্থির থাকতে পারলো না। সে প্রহরের বন্ধু আকাশকে ফোন করে বলল আকাশ, প্রহর হয়তো খুব সমস্যায় আছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখো। আমি ওর বৌ-এর সাথে কথা বলতে চাই। আমি ওদের সুখ নষ্ট করতে চাইনে। আমার যা হবে তা নিয়ে একটুও ভাবিনে। প্লিজ আকাশ, তুমি খোঁজ নিয়ে আমাকে একটু জানাও। আমি আসছি।
প্রকৃত পক্ষে আকাশ এখনও এসব কিছুই শোনেনি এখনও। তবু নদীর কথা মিথ্যে হতে পারে না। আকাশ তখনই ফোন দিল প্রহরকে। প্রহর বলে ঠিক আছে, নদী আসতে চায় বর্ষায় সাথে কথা বল। বর্ষা বলল তুমিই বলে দাও সে আসুক। দুজনে মিলে একটু ঝাল বাটা দিয়ে দেব তোমাকে।
নদীর আর দেরী করা উচিৎ নয়। ও আগেই পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছে সে কোনোদিন বিয়ে করবে না। অবলম্বন হিসেবে বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে দূরে অতি অপরিচিত জায়গায় একটা স্কুল করছে। জায়গাটার কথা সে অন্য কাউকে বলেনি। ঠিক করে রেখছে কাউকে বলবেও না। তবে সময় মতো বর্ষার কাছে কিছু একটা চাইবে বলে সে দাবি রেখেছে। কিন্তু সে সময়টা এখনও অনেক দেরী। তবুও এতটা দেরী করলে প্রহরের অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই এখনই বিষয়টা চুকিয়ে নেয়া দরকার। এর পরে আর কখনও ওদের মুখোমুখি হবে না নদী।
সিদ্ধান্ত মতো আকাশকে সাথে নিয়ে নদী এলো প্রহরের বাড়িতে। নদীকে দেখে বর্ষা বিষ্ময়ে নির্বাক। এ কী, এত সুন্দর সু-শ্রীমতী নদী! ওকে হারিয়ে প্রহর পাগল হয়ে যায়নি! তারপরও আমার প্রতি ওর ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। ওর ভালোবাসায় আমি বুঝতেই পারি না, সে এমন একটি মেয়েকে ভালোবাসে।
তুমি বর্ষা?
প্রশ্ন করল নদী। বর্ষা শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো- হ্যাঁ।
জানি, আমাকে দেখে তোমার হিংসে হচ্ছে। কিন্তু না। আমি তোমার ভাগ নিতে আসিনি বর্ষা। তোমাকে সব বুঝিয়ে দিতে এসেছি। চলো ঘরে গিয়ে বসি।
এভাবে বলো না নদী। তুমি আমাকে কৃপা করেছ। তোমাকে দেখে আমার একটুও হিংসে হয়নি। আমি যে কী ভাবছিলাম তা তোমাকে এই মুহূর্তে বলতে পারব না। এসো, প্রহর ঘরে বসে লিখছে।
ওকে লিখতে দাও। এ সমাজের কাছে ওর অনেক দায় অছে। ওটা চোকাতেই ওর এত লেখালেখি। ওর ওই কাজে তুমি কোনোদিন বাধা দিও না। ওর মনের মধ্যে জমে থাকা সব কথাগুলো এভাবে মানুষের মাঝে প্রকাশ করতে না পারলে বোর হতে হতে একদিন ফ্রিজ হয়ে যাবে। আমার হাতে সময় বেশি নেই। তোমাকে শুধু বলতে এসেছি, তুমি ওকে ভুল বুঝো না। ও সত্যিই একটা ভালো মানুষ। আর তোমার সাথে কথা বলে আমার খুব ভালো লাগে। মাঝে সামান্ন একটা হোঁচট লেগে গেল।
আমাকে লজ্জ্বা দিও না নদী। এ সবই ওর বাড়াবাড়ি। প্রহর, এদিকে এসো, দেখো কে এসেছে। এবার দুজন মিলে তোমাকে--। প্রহর এলো, সেদিনের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলো। প্রহর অনেক রকম বোঝাতে চাইল ওকে। নদী তখন বলল প্রহর, আমি তোমার মতো কাব্য করে ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে পারিনে। তবে তোমার সব প্যাঁচের কথা আমি বুঝি। তোমরা দুজন মন দিয়ে শোনো। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি দূরে কোথাও চলে যাব। আর জায়গাটাও ঠিক হয়ে গেছে। তবে সেটা তোমরা কেউ জানতে চেও না। ওখানে আমি একটা স্কুল করছি। বাকি জীবনটা ওখানেই কাটাব একাকী।
তা হয় না নদী। যা অতীত হয়ে গেছে তা সামনে এনো না। তুমি এখন আমার মতো স্বাভাবিক হয়ে যাও। একটা বিয়ে করো, আমি আবারও বলছি।
না প্রহর, বিয়েটা মনে মনে তোমাকেই করেছিলাম। যেভাবেই হোক ধরে রাখতে পারিনি। তাতে তোমার কোনো দোষ নেই প্রহর। আমার এ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তুমি নিজেকে অপরাধী করো না। তাহলে আমি কষ্ট পাবো।
তুমি যতই বলো নদী, আমারও তো একটা মন আছে। আমার কারণে তোমার জীবনটা-
প্রহর, একজনকে মনে মনে স্বামী বলে মেনে নিয়ে অন্য জনের ঘর করলে যে কুলটা হতে হয়। দোহাই প্রহর, তুমি আমাকে কূলটা হতে বলো না। আমাকে কুল ধরে থাকতে দাও। আর বর্ষা, তোমার কাছে আমার একটা দাবি ছিল। বলো দেবে!
কেন দেব না? তুমি চাইলে ওকেও তোমার হাতে ছেড়ে দেয়া যায়।
ওরে বাপ রে-! আমি কি তাই চাইতে পারি! তুমি আমার বোন। এক বোন কি আর এক বোনের কষ্টের কারণ হওয়া ঠিক?
তাহলে কী চাইছ তুমি? কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করল প্রহর।
প্রহর, আমি তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। তুমি কেন রাগ করছো আমি জানি। কিন্তু আমাকে তুমি রাগাতে পারবে না। অমন সর্বনেশে জিদ আমি ধরব না। তুমি আমাকে যত আঘাত দিয়েই কথা বলো। তারচেয়ে বরং তুমি চুপ থাকো। বর্ষা শোনো, তোমাকে বলি। স্কুলটা করতে একটু সমস্যা হচ্ছে। ওকে আমার গার্জিয়ানশিপের অথরিটিটা দেয়ার অনুমতিটা তোমাকে দিতে হবে।
গার্জিয়ানশিপ-! বিষ্মিত হয়ে প্রশ্ন করল বর্ষা।
ঈষৎ হেসে নদী বলল, ভয় নেই বর্ষা। সমাজ তোমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর অমি কেবল মনে মনে। আইনত আমি অবৈধ। অতএব কোনো অন্যায় আবদার আমি করব না। কেবল পুরুষ শাষিত সমাজের রীতিনীতির কাছে এখনও বাঁধা। আমি নিতান্তই একা, লোকে জানলে অনেক অসুবিধেয় পড়তে হবে আমাকে। তাই তোমার কাছে আমার একটু আবেদন। বর্ষা কিছু বলতে পারলো না। নদী তার সিদ্ধান্তে অটল। প্রহরের কিছুই করার নেই।
হ্যালো- প্রহর, আমি নদী। তুমি কেমন আছো?
আমি ভালো আছি, এটা কার ফোন নম্বর?
কেন- আমার!
তুমি এত ঘন ঘন ফোন আইডি বদলাও কেন?
তোমার জন্য। তোমার সাথে আর যোগাযোগ করব না, তাই। তুমি যাতে আমাকে ফোন দিতে না পারো। কিন্তু জানো প্রহর, নতুন আইডির প্রথম কলটা তোমাকে না করেই পারি না। যে কারণে আইডিটা বদলে ফেলি, ঘুরে ফিরে সেই কাজটাই আগে করে বসি। এমন কেন হয় বলতো প্রহর! প্রহর কোনো কথা বলতে পারলো না। কেঁদে ফেলে নদী। সময়টা তখন রাত দশ এগারোর মাঝামাঝি। প্রহর তখন বিছানায়। পাশে তার স্ত্রী বর্ষা। বিয়ের পর পরই প্রহর সব বলেছে বর্ষাকে। ও কিছু মনে করেনি। নদীর কান্না থামাতে সান্ত¡নার সুরে অনেক মিষ্টি কথা বলল প্রহর। নদী জানতে চাইল বর্ষা পাশে জেগে আছে কি না। প্রহর বলল হ্যা আছে, যা বলো সমস্যা নেই। কান্নার মাঝেই নদী বলল প্রহর, আজকের রাতটার কথা ভাবো তো। তোমার পাশে বর্ষা, আর আমি ছাদে একাকী। প্রহর, যদি পারতাম, আজকের পর পৃথিবীর বুকে আর একটি রাতও আসতে দিতাম না! তাহলে বুকের আগুন কিছুটা নিভে থাকতো। বর্ষাকে আমি চোখে দেখিনি। না জানি ও কত পূণ্যবতী। কত সাধনা করেছিল সে। তাই সে তোমাকে আমার কাছ থেকে--। লাইন কেটে দিল। প্রহর নিজের ফোন সেট থেকে ফোন দিল কয়েকবার। নদী রিসিভ করলো না। আর ঘুমাতে পারলো না প্রহর। বর্ষা সব বুঝতে পারলো, বলল না কিছুই। এ রাতে আর কোনো কথাই হলো না দুজনের মাঝে। ফোন সেটটা বন্ধ করে রেখে দিল প্রহর।
রাতে ঘুমতে পারেনি বর্ষাও। সকালে ফোলা ফোলা চোখে তাকিয়ে বলল, শোনো প্রহর- আমি জানি তুমি নদীর সাথে কথা না বলে থাকতে পারবে না। তাই বলি, কথা তুমি বলবে। তবে আমার সামনে নয়, আড়ালে। তুমি পুরুষ, এটা যে আমার জন্য কত কষ্টের- সে তুমি বুঝবে না।
প্রহরের সমস্ত চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল। তাই তো, যার ভুলেই হোক, যে ভুলেই হোক, দুজন দুদিকে ছিঁটকে পড়েছি। এখন তাকে নিয়ে আমার দাম্পত্যের মাঝে অশান্তি ডেকে আনব কেন? তাছাড়া নদীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলে সেও ধীরে ধীরে সয়ে নেবে। এটা হতেই হবে। হ্যাঁ, নদীকে বললে ব্যপারটা সে বুঝবে। রাতে সে কেঁদেছে খুব। এখন তাকে কিছু একটা বলা দরকার। নদীকে ফোন দিল প্রহর। নদী এবারও রিসিভ করল না। প্রহর বুঝল নদী কী একটা জিদ ধরেছে। কিছুক্ষণ পর সে অন্য একটা ফোন থেকে ফোন দিল নদীকে। এবার নদী রিসিভ করল। বর্ষার বলা কথাগুলো নদীকে বলল প্রহর। আরও সে নদীকে ফোন দিতে নিষেধ করল। প্রহরও তার ফোন আইডি বদলে ফেলল।
নদী অনেকবার চেষ্টা করে প্রহরের ফোনটা খোলাই পেল না। ভাবে তাই তো, আমার জন্য প্রহরের দাম্পত্য অশান্তিতে ভরে থাকবে! আমি প্রহরের কষ্ট সহ্য করতে পারব না। আমার ভুলে আমি ওকে পাইনি। সে শাস্তি পেতে পারে না। আমি বর্ষার সাথে দেখা করব। ওকে সব বলে বোঝাব। আবার ভাবে তাই তো, আমি ওর সামনে গেলে যদি আরও ক্ষেপে যায়! কোনো কিছুতে সান্ত¡না পায় না নদী।
প্রহরের মনে যত কষ্টই থাক, বর্ষার সাথে সে স্বাভাবিকই থাকে। বর্ষাকে সে ভালোবাসে খুব। কেন নয়? বর্ষা তো কোনো অন্যায় করেনি। প্রহর নিজে তাকে বিয়ে করে এনেছে। রাতে বিছানায় শুতে গিয়ে বর্ষা বলল, নদী আর ফোন দিয়েছে?
ও আর ফোন দেবে না।
কেন?
আমি নিষেধ করে দিয়েছি। নতুন ফোন আইডিটা ওকে দিইনি। তুমি বিশ্বাস করো বর্ষা-
প্রহর, তুমি যে কী! মেয়েটাকে কত কষ্ট দিলে তুমি, তা একবার ভেবে দেখছ? আমি এটা বলিনি তোমাকে প্রহর!
আজ বলোনি। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একদিন তোমাকে বলতে হতে পারে। তাই তার আগেই যেটা উচিৎ, সেটাই আমি করেছি। এটা এ পর্যন্তই-
না, তা হয় না। আশ পাশের আর পাঁচটা বৌ-এর মতো করে আমাকে দেখো না প্রহর। আমি ঠিক আমার মতোই থাকতে চাই। শোনো, নদী তোমাকে কাছে পায়নি, পাবেও না কোনোদিন, সে তা জানে, মানে, বিশ্বাসও করে। তারপরও সে তোমার সাথে কথা বলে কষ্টে ভরা বুকটার কিছুটা হালকা করে। তুমি তা থেকেও তাকে বঞ্চিত করলে- হয় সে মারা যাবে, না হয় পাগল হয়ে যাবে। এটা তুমি করো না প্রহর। ওর কিছু হয়ে গেলে আমাকেই দায়ী থাকতে হবে। দাও, ফোনটা দাও, আমি ওর সাথে কথা বলব।
উপায় নেই বর্ষা। ওর নতুন ফোন আইডি আমার কাছে নেই। ফোন করে ওকে পাবে না তুমি।
তুমি আস্ত একটা গাড়ল। বোধ ভাস্যি কিছুই নেই তোমার। প্রহর, তুমি জানো না ওর সাথে আমার কী কথা হয়েছে! কিন্তু তোমার এই ব্যবহারে সে কী ভাববে-এটাই আমার দুঃখ। ও যে কত ভালো মেয়ে আমি বুঝে গেছি। তাই তো তোমাকে বাধা দিইনি। প্রহর আমি তোমার স্ত্রী হতে পেরে কত জনমের সুখ এক জনমেই হাতের মুঠোয় পেয়েছি তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। এটা কার জন্য জানো? নদীর জন্য। নদী ওইদিন তোমার হাত ধরে বেরিয়ে এলে তুমি আমাকে বিয়ে করতে না। থাক ওসব, তুমি ফোনে পুরনো আইডিটা লাগাও। ও অবশ্যই ফোন করবে। সে তোমার কাছে ফোন না করে পারে না।
এই মুহুর্তে প্রহর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকা বলে জানলো। প্রহর ভাবে সে আজও নাবালক। যেন কোনোদিন সাবলক হয়নি। কৈশোর পেরিয়ে আদৌ সে যৌবন প্রাপ্ত হয়নি। ও-এতদিন যা বুঝেছে তার সবই ছিল আবেগ, ছিল ভুল। এখনও সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। নদীর কথা শুনেই যে বর্ষার তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠার কথা ছিল, সেই বর্ষা কি না নদীর জন্য ব্যকুল। বিশ্ব প্রকৃতির এ কি রহস্য! প্রহর কেবলই বিষ্মিত হয়।
বর্ষার স্বীকৃতি পেয়ে প্রহরের আনন্দে লাফিয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু সে যেন কেমন বোর হয়ে যাচ্ছে। প্রহরকে পেয়ে বর্ষা যে মহাসুখী সে তা জানালো। কিন্তু বর্ষাকে পেয়ে প্রহর ও যে কতটা ধন্য তা ওকে বলে বোঝানোর ভাষা খুঁজে পায় না সে। পৃথিবীর সব নারী থেকে একেবারেই আলাদা ধাচের মেয়ে বর্ষা। কিন্তু নদী! হ্যাঁ, এখনকার বিষয়টা বর্ষার উপরই ছেড়ে দেয়া উচিৎ। কথা বাড়ালো না প্রহর। পুরনো আইডিটা সেট করল ফোনে। নদীর পুরনো আইডিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো বর্ষা।
প্রহরকে ফোনে না পেয়ে নদী আর স্থির থাকতে পারলো না। সে প্রহরের বন্ধু আকাশকে ফোন করে বলল আকাশ, প্রহর হয়তো খুব সমস্যায় আছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখো। আমি ওর বৌ-এর সাথে কথা বলতে চাই। আমি ওদের সুখ নষ্ট করতে চাইনে। আমার যা হবে তা নিয়ে একটুও ভাবিনে। প্লিজ আকাশ, তুমি খোঁজ নিয়ে আমাকে একটু জানাও। আমি আসছি।
প্রকৃত পক্ষে আকাশ এখনও এসব কিছুই শোনেনি এখনও। তবু নদীর কথা মিথ্যে হতে পারে না। আকাশ তখনই ফোন দিল প্রহরকে। প্রহর বলে ঠিক আছে, নদী আসতে চায় বর্ষায় সাথে কথা বল। বর্ষা বলল তুমিই বলে দাও সে আসুক। দুজনে মিলে একটু ঝাল বাটা দিয়ে দেব তোমাকে।
নদীর আর দেরী করা উচিৎ নয়। ও আগেই পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছে সে কোনোদিন বিয়ে করবে না। অবলম্বন হিসেবে বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে দূরে অতি অপরিচিত জায়গায় একটা স্কুল করছে। জায়গাটার কথা সে অন্য কাউকে বলেনি। ঠিক করে রেখছে কাউকে বলবেও না। তবে সময় মতো বর্ষার কাছে কিছু একটা চাইবে বলে সে দাবি রেখেছে। কিন্তু সে সময়টা এখনও অনেক দেরী। তবুও এতটা দেরী করলে প্রহরের অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই এখনই বিষয়টা চুকিয়ে নেয়া দরকার। এর পরে আর কখনও ওদের মুখোমুখি হবে না নদী।
সিদ্ধান্ত মতো আকাশকে সাথে নিয়ে নদী এলো প্রহরের বাড়িতে। নদীকে দেখে বর্ষা বিষ্ময়ে নির্বাক। এ কী, এত সুন্দর সু-শ্রীমতী নদী! ওকে হারিয়ে প্রহর পাগল হয়ে যায়নি! তারপরও আমার প্রতি ওর ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। ওর ভালোবাসায় আমি বুঝতেই পারি না, সে এমন একটি মেয়েকে ভালোবাসে।
তুমি বর্ষা?
প্রশ্ন করল নদী। বর্ষা শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো- হ্যাঁ।
জানি, আমাকে দেখে তোমার হিংসে হচ্ছে। কিন্তু না। আমি তোমার ভাগ নিতে আসিনি বর্ষা। তোমাকে সব বুঝিয়ে দিতে এসেছি। চলো ঘরে গিয়ে বসি।
এভাবে বলো না নদী। তুমি আমাকে কৃপা করেছ। তোমাকে দেখে আমার একটুও হিংসে হয়নি। আমি যে কী ভাবছিলাম তা তোমাকে এই মুহূর্তে বলতে পারব না। এসো, প্রহর ঘরে বসে লিখছে।
ওকে লিখতে দাও। এ সমাজের কাছে ওর অনেক দায় অছে। ওটা চোকাতেই ওর এত লেখালেখি। ওর ওই কাজে তুমি কোনোদিন বাধা দিও না। ওর মনের মধ্যে জমে থাকা সব কথাগুলো এভাবে মানুষের মাঝে প্রকাশ করতে না পারলে বোর হতে হতে একদিন ফ্রিজ হয়ে যাবে। আমার হাতে সময় বেশি নেই। তোমাকে শুধু বলতে এসেছি, তুমি ওকে ভুল বুঝো না। ও সত্যিই একটা ভালো মানুষ। আর তোমার সাথে কথা বলে আমার খুব ভালো লাগে। মাঝে সামান্ন একটা হোঁচট লেগে গেল।
আমাকে লজ্জ্বা দিও না নদী। এ সবই ওর বাড়াবাড়ি। প্রহর, এদিকে এসো, দেখো কে এসেছে। এবার দুজন মিলে তোমাকে--। প্রহর এলো, সেদিনের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলো। প্রহর অনেক রকম বোঝাতে চাইল ওকে। নদী তখন বলল প্রহর, আমি তোমার মতো কাব্য করে ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে পারিনে। তবে তোমার সব প্যাঁচের কথা আমি বুঝি। তোমরা দুজন মন দিয়ে শোনো। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি দূরে কোথাও চলে যাব। আর জায়গাটাও ঠিক হয়ে গেছে। তবে সেটা তোমরা কেউ জানতে চেও না। ওখানে আমি একটা স্কুল করছি। বাকি জীবনটা ওখানেই কাটাব একাকী।
তা হয় না নদী। যা অতীত হয়ে গেছে তা সামনে এনো না। তুমি এখন আমার মতো স্বাভাবিক হয়ে যাও। একটা বিয়ে করো, আমি আবারও বলছি।
না প্রহর, বিয়েটা মনে মনে তোমাকেই করেছিলাম। যেভাবেই হোক ধরে রাখতে পারিনি। তাতে তোমার কোনো দোষ নেই প্রহর। আমার এ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তুমি নিজেকে অপরাধী করো না। তাহলে আমি কষ্ট পাবো।
তুমি যতই বলো নদী, আমারও তো একটা মন আছে। আমার কারণে তোমার জীবনটা-
প্রহর, একজনকে মনে মনে স্বামী বলে মেনে নিয়ে অন্য জনের ঘর করলে যে কুলটা হতে হয়। দোহাই প্রহর, তুমি আমাকে কূলটা হতে বলো না। আমাকে কুল ধরে থাকতে দাও। আর বর্ষা, তোমার কাছে আমার একটা দাবি ছিল। বলো দেবে!
কেন দেব না? তুমি চাইলে ওকেও তোমার হাতে ছেড়ে দেয়া যায়।
ওরে বাপ রে-! আমি কি তাই চাইতে পারি! তুমি আমার বোন। এক বোন কি আর এক বোনের কষ্টের কারণ হওয়া ঠিক?
তাহলে কী চাইছ তুমি? কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করল প্রহর।
প্রহর, আমি তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। তুমি কেন রাগ করছো আমি জানি। কিন্তু আমাকে তুমি রাগাতে পারবে না। অমন সর্বনেশে জিদ আমি ধরব না। তুমি আমাকে যত আঘাত দিয়েই কথা বলো। তারচেয়ে বরং তুমি চুপ থাকো। বর্ষা শোনো, তোমাকে বলি। স্কুলটা করতে একটু সমস্যা হচ্ছে। ওকে আমার গার্জিয়ানশিপের অথরিটিটা দেয়ার অনুমতিটা তোমাকে দিতে হবে।
গার্জিয়ানশিপ-! বিষ্মিত হয়ে প্রশ্ন করল বর্ষা।
ঈষৎ হেসে নদী বলল, ভয় নেই বর্ষা। সমাজ তোমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর অমি কেবল মনে মনে। আইনত আমি অবৈধ। অতএব কোনো অন্যায় আবদার আমি করব না। কেবল পুরুষ শাষিত সমাজের রীতিনীতির কাছে এখনও বাঁধা। আমি নিতান্তই একা, লোকে জানলে অনেক অসুবিধেয় পড়তে হবে আমাকে। তাই তোমার কাছে আমার একটু আবেদন। বর্ষা কিছু বলতে পারলো না। নদী তার সিদ্ধান্তে অটল। প্রহরের কিছুই করার নেই।

Comments
Post a Comment