গৈ-গেরামের মেঠেপথ

ফিচার

হিমাংশু দেব বর্মণ :
সারা দেশে ধানকাটা শুরু হয়েছে পুরো দমে। মাঠভরা ধান দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। এই হাসির আড়ালে তাদের ঘাম, ক্লান্তি, বেদনা সব লুকিয়ে আছে। যা তাদের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি না গেলে একদম চোখে পড়বে না। যেটুকু বা পড়ে সেটুকুও অনুভূতিতে আসার মতো কোমল হৃদয় আমাদের নেই। হয়তো বা আছেও। কিন্তু পুঁজিবাদের দৌরাত্মে নিজের অবস্থান অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই আমরা। তারা কখনো মুখ ফুটে তাদের কষ্টের কথা বললেও আমরা তাদের সান্ত¡না দিয়ে ভুলিয়ে রাখি “তোমরাই ভালো আছো”। তাদেরকে দু’ছত্র কবিতা শুনিয়ে দিই “সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা”। আমাদের এসব ব্যবহারে তারা বুঝে নেন যে, তাদেরকে ফুলিয়ে তুলতে আর ঘুম পাড়িয়ে রাখতে আমরা খুবই পারদর্শী।
কিন্তু কবির কথাগুলো কেবল তাদেরকে বুঝিয়ে রাখার জন্যই না বলে আমরাই কথাটার মর্মার্থ উপলব্ধি করি না কেন? সত্যিই এদেশের কৃষকের মত বড় সাধক আর কেউ নেই। কারণটা আমরা সামান্য ভাবলেই পেয়ে যাব।
আমাদের দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে আগাগোড়াই এটা কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু বর্তমানে অধিক পরিমানে জনসম্পদ রপ্তানির কারণে রেমিটেন্সের আয় বেড়েছে অধিক। এখন আর প্রচারে কৃষিপ্রধান দেশ কথাটা তেমন শোনা যায় না। কৃষির উৎপাদনও তো বেড়েছে কয়েক গুণ। ছোট বেলায় দেখেছি যে-জমিতে বছরে একটি আবাদ হয়েছে, চাষপ্রাণালীর আধুনিকীকরণ ও তারও আগে সেচ প্রদ্ধতির প্রচলন হওয়ায় সেই জমিতে এখন বছরে তিনটি আবাদ হচ্ছে। ফলনও অনেক বেশি।
এই জমির আবাদ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সমস্ত কৃতিত্বই কৃষকের। তার প্রেক্ষিতে তারা পেল না কিছুই। শুধু দিয়েই গেল। কথাটা মেনে নিতে হয়তো অনেকেরই আপত্তি থাকবে। কিন্তু কিছুই করার নেই। এটা মিথ্যা হলে নিজেরও ভালো লাগতো। এর সত্যতা প্রমাণের জন্য কিছুক্ষণের জন্য একটু পেছনে ফিরে তাকাই।
আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদ শাহীর আমলে ক্ষেতমজুররা আন্দোলন করেছিল চার সের চাউল অথবা তার সমপরিমাণ মূল্য পাওয়ার দাবীতে। কিন্তু কৃষক দিলো কত? বর্তমানে গ্রামের মানুষ যে চাউল খায়, তার স্থানীয় মূল্য সর্বোচ্চ কেজি প্রতি ৪০ টাকা। বেশির ভাগ সময় ৩০ টাকা দরই চলে। ৪০ টাকা ধরলেও চার কেজি চাউলের মূল্য আসে ১৬০ টাকা। আর সেখানে একজন মজুর দৈনিক পারিশ্রমিক পায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এটা স্বাভাবিক দর। আর কাজের যখন ভিড় লেগে যায় তখন ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পায়। তারপরও ক্ষেতমজুররা পুরো ৮ ঘন্টা কাজ করেন না।
তাহলে বিষয়টি কী দাড়ালো? কৃষককের কাছে যা দাবী করলো কৃষক তার বেশি দিলো। কিন্তু কৃষকের দাবী তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্যটা পাওয়া। তা কৃষক পেল না। এসব নিয়ে তাদের মনে খেদ আছে, ক্ষোভ নেই। এমন মহানুভবতা কার আছে, একমাত্র কৃষক ছাড়া!
কৃষকদের সরকারি টাকা ফাঁকি দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল, জমির খাজনা, আয়কর পরিশোধ করেন তারা নগদে। কারণ বিলম্ব হলে যে জরিমানা দিতে হবে সেটা যাতে না গুনতে হয়। নিয়মিত ব্যাংক ঋণও শোধ করেন তারা। কারণ এদেশে সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করেলে হাতে বেড়ি পরতে হয় একমাত্র কৃষকেরই। সমাজের উপরতলার লোকেদের বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল, টেলিফোন বিল বাকি থাকে। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা সরকারের আয়কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য প্রয়োজন না হলেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বসে থাকে। তাতে যে পরিমাণ সুদ দিতে হয় তার তুলনায় অনেকগুণ বেশি টাকা সরকারি খাতে দেওয়া থেকে মাফ পেয়ে যায়। তারা এভাবে দেশকে চুষে খায়। কিন্তু চাষী কখনই এমন কিছু করে না।
গ্রামের দিকে যদি একটু কান খাড়া করে শুনতে চাওয়া হয় সেখানকার দিনান্ত পরিশ্রম করা চাষীদের কথা। যদি প্রশ্ন করা হয়, কেমন আছেন? প্রথমেই একগাল হাসি দিয়ে উত্তরটা জানিয়ে দেন খুব ভালো আছেন তিনি। কিন্তু যখনই তাদের ফসল উৎপাদনের বিবরণ জানতে চাওয়া হয়, তখন যে বিবরণ দেন, তাতে বোঝা যায় তার চোপরা-ভাঙা গালে হাসিটা এমনভাবে ফুটে ওঠে, শত দৈনতার মাঝেও ওই হাসিটুকু আছে বলেই হয়তো তারা ভালো থাকেন, বেঁচে থাকেন। কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশকসহ সকল পণ্যের মূল্য অধিক। তারপর তাদের উৎপাদিত ফসলের মূল্য খরচমূল্যের চেয়ে অনেক কম। তবুও তারা চাষের কাজ কীভাবে করেন, এমন প্রশ্ন করলে তারা জানান সারা মৌসুম খরচ করে ফসল ঘরে উঠলে একসময় একসাথে অনেক  ফসলের যে মূল্য আসে তাতে একটা সান্ত¡না থাকে। যদিও প্রাপ্তিটা পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া এটা না করেও তো উপায় নেই। তাই কোনোরকম মাথাটা বাঁচিয়ে চাষের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। আর বর্গাচাষীদের তো সেই সান্ত¡নাটুকুও থাকে না। তারা অন্যের জমিতে মজুর খেটে যা পান, তা দিয়ে সংসার চালিয়ে, অন্যের জমি চাষ করেন বর্গায়। ফসল-এর এক তৃতীয়াংশ মালিককে দিয়ে তার অবশিষ্ট যা থাকে। তার সমপরিমাণ মূল্য হিসেব করলে ওই ব্যক্তির আর কিছু থাকে না।
তারপরও আছে বিভিন্নভাবে প্রতারিত হওয়ার ব্যাপার। সরকারের নির্ধারিত মূল্য তারা পান না। ওটা পান মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া, দালালরা। এ নিয়ে তাদের মনে যে ক্ষোভ তা প্রকাশ করতেও তাদের কোথায় যেন আপত্তি। আর এই আপত্তিটা বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ভরসা-অভরসার জায়গা থেকে। কারণ তাদের বিশ্বাস করার মতো আর কেউ নেই। কোনো রাজনৈতিক দলও দৃশ্যমান অবস্থায় নেই আমাদের দেশে। কিন্তু নিরূপায় হয়েই তারা মুখ বন্ধ রাখেন। এমন কী নিজেদের মধ্যেই তারা একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারেন না। যার ফলে তারা সংগঠিত হতেও পারেন না।
আর একটা বড় সমস্যা হলো চাষীর উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণের। প্রতি ক্ষেত্রেই আমরা দেখি কোনো দ্রব্য যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। সেই প্রতিষ্ঠানই তার বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে। কিন্তু চাষীর উৎপাদিত পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কখনই চাষীর হাতে থাকে না। যারা ক্রেতা তাদের হাতে এই মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা। তাহলে বিষয়টি কতটা মর্মান্তিক! অন্যান্য ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদক তার মূল্য নির্ধারণ করার সময় ঐ দ্রব্য উৎপাদনের মূল খরচ বাঁচিয়ে তার পরও তার যথাযথ লভ্যাংশ রেখেই ঐ দ্রব্যের বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে। এতে করে তার লাভের অংকটা তার হিসাবমতোই থেকে যায়। আর ক্রেতারা সেটা দিতে বাধ্য থাকে। কৃষকের বেলায় ঘটলো অন্য ঘটনা। কৃষকের দ্রব্য উৎপাদনের খরচ কী পরিমান হলো, ঐ ক্রেতা তো সেই হিসাব করলো না। সে তার সুবিধামতো দ্রব্য মূল্যটা নির্ধারণ করলো। তাতে চাষীর লাভ লোকসানের হিসাব চাষী নিজেই করল কিন্তু লোকসানের খাতাটাই পূর্ণ হলো। লাভের কিছু থাকলো না কৃষকের জন্য। এত কিছুর পরেও কৃষক কখনই কাস্তে কোদাল নিয়ে রাজপথে দাড়ায় না সেøাগানমুখর হয়ে। তারা কখনও প্রতিবাদী হয়ে ওঠে না।
আমাদের দেশের যে ভৌগোলিক অবস্থান, যে মৌসুমী জলবায়ু- এসবের ফলেই আমাদের দেশ চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী একটা অঞ্চল। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, ফলে নদীর পলিবাহিত সমভূমি ফসল উৎপাদনের জন্য স্বর্গীয় ভূমি। আজ আমরা যতই নিজেদেরকে আধুনিক বলে দাবি করি, আসলে কৃষি ব্যবস্থাটাকে আমরা যদি সম্পৃর্ণভাবে আধুনিকায়নের আওতায় আনতে পারি তাহলে আমাদের ঐ রেমিটেন্সের উপর নির্ভর করতে হয় না। ঐ বস্ত্রশিল্পের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য সাম্রাজ্যবাদের কাছে ধরণা দিতে হয় না। কথাটা এ-কারণে বলা- আমাদের রেমিটেন্সের জন্য বিদেশ গমনের অনুমোদন হুবহু থাকলেও সেখানে সাধারণ মানষ যেভাবে প্রতারিত হচ্ছে তা অতি অমানবিক। আর বস্ত্রশিল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্রাজ্যবাদের যে পাতানো ফাঁদে বারবার আমাদেরকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, আর আমাদেরকে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। আমাদের সেই সাম্রাজ্যবাদের মুখাপেক্ষি হতে হয় না। তাদের সাথে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনো চুক্তি করতে হয় না। যদি আমরা এদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে একটা শক্তিশালী অবস্থানে নেয়ার চেষ্টা করি, তাহলে আমাদের কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না, হয়রানি হতে হয় না।
অতি প্রাচীনকাল থেকে আজ আবধি আমাদের দেশের গ্রামের মানষেরা কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ঘরে তোলে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছাস সব ধরণের বৈরী প্রকৃতি তাদের জীবনের ওপর ভর করে চলে। তাদের জীবনে এসবের কোনো প্রভাব পড়তে দেখি না আমরা। শত দৈনতার মাঝেও আমরা তাদের প্রতিবাদী হতে দেখি না। কেবল কৃষিখাত ব্যতীত অন্য সব উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন বিরাজমান সর্বত্রই। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেড়েই চলেছে অহরহ। কেবল কৃষিতেই তা সম্ভব হতে দেখা যাচ্ছে না। বরং কৃষির জমি কমছে তো কমছেই। আবাদী জমিতে বসতি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, একাধিক অংশীদারের মধ্যে ভাগাভাগি এসব কারণে দিনের পর দিন আবাদী জমি কমে আসছে। তাহলে আগের তুলনা জমি কমছে। জমির মালিক চাষে অনিহা প্রকাশ করে তার জমি ভূমিহীন বর্গাচাষীদের কাছে বর্গা দিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে বর্গাচাষীরা যে বেশ লাভবান হয়ে থাকেন তা কিন্ত না। তারপরও তারা এটা করে থাকেন। অথচ খাদ্য পণ্যের উৎপাদন হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে উৎপাদন বৃদ্ধির এই বাহবা কৃষকের প্রাপ্য হতে দেখা যাচ্ছে না। সেটা সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকার, নেতা, বা সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের ওপরই বর্তা। ক্রেডিট নেয়ার সময় আমরা ঐ দিনান্ত পরিশ্রম করা কৃষকদের সামান্য ধন্যবাদ দিতেও ভুলে যাই।
এখন এই সময়ে আমরা গ্রামের দিকে একটু তাকালেই দিব্যি চোখে পড়বে ধান কাটার কাজে তারা কতটা ব্যস্ত আছেন। রাতে বিরাম নেই। দিনেও ক্লান্তি নেই। তারপরও আছে ঝড় আর বৃষ্টি। ধান শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত রোদের অভাব। ভিজে ধান শুকাতে না পারলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। দর্গন্ধ হয়ে যাবে। কত না সমস্যার মোকাবিলা করে তারা তাদের এবং আমাদের পেটের অন্ন যোগানের ব্যবস্থা করেন। আর আমরা কাউকে গালি দিতে গেলে তাদের নাম তুলে গালিটা দিতে ভুল করি না ‘শালা অভদ্র চাষার বাচ্চা’ বলে। এভাবে গালি দোয়র আগে এতটুকু ভেবে দেখি না নিজে কতটক ভদ্রতা লালন করে চলি। আর আমরা তাদের থেকে নিজেদেরকে এতটা দূরে রাখি বলেই তাদেরকে অভদ্র বলে ভেবে থাকি। আসলে তারা অভদ্র না। তাই দি হতো, তাহলে তাদেরকে আমরা এভাবে ব্যবহার করতে পারতাম না। অবশ্যই তারা ক্ষেপে গিয়ে তাদের নিড়ানি, কাস্তে, কোদাল নিয়ে ফসলের মাঠ ছেড়ে রাজপথে এসে অবরোধ ডেকে বসতো। অতএব আমরা তাদেরকে কেবল ভদ্রই না, তাদেরকে গ্রামগুলোকে ভদ্রতার সুতিকাগার বলতে পারি নিঃসন্দেহে।
কলকারখানাসহ অন্য সব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিদের ছুটির ব্যবস্থা আছে। সাপ্তাহিক ছটিসহ বছরের প্রায় এক চতৃর্থাংশ সময় ছুটি পেয়ে থাকেন তারা। কিন্ত চাষীর জীবনে কোনো ছুটি নেই। তাদের অসুখ বিসুখ নেই। অসুস্থ দেহে তাদের ছুটতে হয় ক্ষেতে খামারে। তারপরেও তাদের নাম স্মরণ করতে আমাদের কোথায় যেন বাধা। আসলেই কি আমাদের ছন্নছাড়ামীতে পেয়েছে? আমরা কি পারি না আমাদের আত্মগরিমাকে বিসর্জন দিয়ে বাংলার এই মহান কৃষককে জাতির সামনে তুলে ধরার কোনো ব্যবস্থা করতে! অবশ্যই পারি। আসুন, একটিবার গ্রামের দিকে যাই। কোমল হৃদয় নিয়ে তাদের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি হই একটিবার।


লেখক : কলামিস্ট
মুঠো ফোন : ০১৭২৩-৮২২০৪৭

Comments